কালান্তরের কড়চা


চক্রান্তের ছুরি ভোঁতা করার জন্য শুধু উন্নয়ন নয়, সুশাসন দরকার

আরএইচডিএএল.কম : মঙ্গলবার ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ :
সূত্র: কালের কন্ঠ :
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
 

একটি মার্কিন সংস্থায় জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা যে বেড়েছে তা খালি চোখেও দেখা যায়। সে জন্য জরিপের চশমা চোখে লাগাতে হয় না। এই জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণও আছে। সব দেশের মানুষই একজন সাহসী নেতাকে ভালোবাসে। এ জন্য ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার বা ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অতি ব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও তাঁরা দল-মত-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করেছিলেন।

বাংলাদেশে এই সাহস ও দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর পর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। এ জন্যই দেশের মানুষের মনে তাঁর প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা বেড়েছে। তাঁর এই জনপ্রিয়তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু ‘ম্যাডাম নো’র দল বিএনপি এই সত্যটি স্বীকার করার মতো নৈতিক সাহস দেখাতে পারেনি। এই সত্য স্বীকার করতে গেলে তাদের এই সত্যটিও স্বীকার করতে হবে যে তাদের নেত্রী ‘ম্যাডাম নো’র জনপ্রিয়তায় এখন ধস নেমেছে। এমনকি তাঁর নিজের দলেও ভাঙনের সুর বাজছে। অনেকে ঠাট্টা করে বলছে, বিএনপির এখনো ভোট আছে, জনসমর্থন নেই। ভোট যে আছে তার কারণ আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে ছাত্রলীগের এক শ্রেণির নেতাকর্মীর দুর্বৃত্তপনা।

শেখ হাসিনা যে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেত্রী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা বাড়ার একটা বিপদ এই যে কোনো নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তাঁর দলকে এবং দেশের রাজনীতিকেও বেশি দিন স্থিতিশীলতা দিতে পারে না। কারণ ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। ভারতে গত সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি জিতেছে দলীয় শক্তি ও জনপ্রিয়তার জোরে নয়, জিতেছে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত বিপুল জনপ্রিয়তার জোরে। এই জনপ্রিয়তার ওপর বিজেপির ভাগ্য নির্ভর করে। আর এই জনপ্রিয়তারও যে দ্রুত ওঠানামা আছে তার প্রমাণ দিল্লির রাজ্য পরিষদের নির্বাচনে বিজেপির পরাজয়।

বাংলাদেশেও বর্তমানে শেখ হাসিনা তাঁর দেশসেবা ও দেশপ্রেম দ্বারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। কিন্তু তাঁর দল আওয়ামী লীগ এই জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। এ জন্য আওয়ামী লীগের এবং তার কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের কর্মকাণ্ডই দায়ী। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে আওয়ামী লীগ এখন বিএনপির রেকর্ড ছুঁই ছুঁই করছে। এই অবস্থায় বিএনপি নেত্রী সংগতভাবেই আশা করছেন, অবিলম্বে তাঁদের পছন্দমতো একটি ‘নিরপেক্ষ সরকারের’ অধীনে নির্বাচন হলে তাঁরা জিতবেন। এ জন্যই বেগম জিয়া ও তাঁর দলের সমর্থকরাও অবিলম্বে নির্বাচন চাই বলে জিগির তুলছে। তবে এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে কোন দল জয়ী হবে, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। কারণ আওয়ামী লীগ এখন দলের নেত্রীর জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল। দলের নিজস্ব জনপ্রিয়তা তৈরি হয়নি, বরং তা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

এই ধরনের অবস্থা দেখা দিয়েছিল ১৯৭৪-৭৫ সালেও। দলকে ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু অনেক বড় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর একক ব্যক্তিত্ব দ্বারা চালিত হচ্ছিল দেশ, রাষ্ট্র ও তাঁর দল। আওয়ামী লীগ তখন অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত। ছাত্রলীগ দুই ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ জাসদ তৈরি করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়েছে। এক বঙ্গবন্ধুর নামের ওপর টিকে আছে দেশ ও রাষ্ট্র। শত্রুরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, একজন মানুষকে হত্যা করতে পারলেই তাদের কার্যোদ্ধার হবে। আওয়ামী লীগ বা বাকশালের কোনো সাধ্য নেই, সংগঠন-শক্তি নেই যে তাদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে পারবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরবেলা তাদের এই অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

বর্তমানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ও প্রভাবের দিক থেকে প্রায় বঙ্গবন্ধুর সমপর্যায়ে পৌঁছেছেন। সরকার ও দল তাঁর হাতের মুঠোয়। তাঁর ইচ্ছায় ওঠে ও বসে। তিনি সাহসের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেক ভালো কাজ করেছেন। তিনি আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংকের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা তাই অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু কেবল জনপ্রিয়তা কোনো শক্তিশালী নেতা-নেত্রীর রক্ষাকবচ নয়। একক জনপ্রিয়তা কোনো নেতা-নেত্রীকে রক্ষা করতে পারে না। পারলে চিলির জনপ্রিয় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যা করা সম্ভব হতো না। জনপ্রিয়তার সঙ্গে তাঁর সংগঠন-শক্তি যদি খাড়া থাকত, তাহলে আলেন্দেকে হত্যা করা হতো অসম্ভব। এই সংগঠন-শক্তি আগেই সিআইএ ভেঙে দিয়েছিল। কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ত্রোর রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি ধ্বংস করা সিআইএর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই সিআইএ ১১৭ বার তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

বাংলাদেশেও স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ যখনই উপলব্ধি করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অপ্রতিরোধ্য, এই নেতৃত্বকে স্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে হটানো যাবে না কিংবা তাঁর ক্ষমতায় যাওয়া বন্ধ করা যাবে না তখনই তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। তাঁর জীবননাশের সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, যা গ্রেনেড হামলা নামে পরিচিত। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন বলে বাংলাদেশও রক্ষা পেয়েছে। তাঁর রক্ষাকবচ ছিল তাঁর সংগঠনের শক্তি এবং জনগণের সমর্থন।

বর্তমানে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার শীর্ষে আছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা জনবিচ্ছিন্ন হয়েছেন। আমলা ও উপদেষ্টাদের পরামর্শ দ্বারাও কিছুটা প্রভাবিত হচ্ছেন। তাঁর সংগঠনটি এখন স্বার্থদ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে জর্জরিত। একদল মন্ত্রী ও এমপির দৌরাত্ম্যে জনজীবন অতিষ্ঠ। এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের ওপর দলটি টিকে আছে। নেত্রী দলের ওপর নির্ভরশীল নন, দল নেত্রীর ওপর নির্ভরশীল।

এই অবস্থাটি দেশের জন্য বিপজ্জনক। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগেরও জনপ্রিয়তা বাড়ানো দরকার। নইলে স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ ভাবতে পারে (হয়তো ভাবছেও) শেখ হাসিনাকে যখন স্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে হটানো যাবে না তখন পঁচাত্তরের মতো অস্বাভাবিক পন্থা গ্রহণ করা দরকার। হাসিনা এখন একা ক্ষমতায় শীর্ষে। তাঁকে সরাতে পারলেই কেল্লাফতে। বাংলাদেশে সম্ভবত এ জন্যই কিছু কিছু লোকের মনে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে পঁচাত্তরের মতো একটা অঘটন ঘটানোর চক্রান্ত চলছে।

আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে এই শঙ্কাটি পোষণ করি না। পঁচাত্তরের পটভূমি দেশে এখন নেই। দেশে কোনো দুর্ভিক্ষাবস্থা নেই। সামরিক বাহিনীতেও কোনো জেনারেল ক্ষমতালিপ্সু হলে তার পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো জেনারেলরা আছেন। এটা প্রমাণিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস বঙ্গভবনে থাকাকালে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায়। এক-এগারোর সময় অনুগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঁধে পা রেখে জেনারেল মইনের ক্ষমতা দখলের চেষ্টাও সফল হয়নি।

তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশে এখন ক্যু ঘটানোর ব্যর্থ চেষ্টার বদলে অ্যাসাসিনেশন-প্রচেষ্টা হতে পারে। এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করার জন্য শুধু সরকারি রক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, এই ব্যবস্থা তো প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং ইন্দিরা গান্ধীরও ছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে তো তাঁর দেহরক্ষীই গুলি করেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা (এবং দেশেরও নিরাপত্তা) নিশ্চিত করার জন্য সরকারি রক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংগঠনের শক্তির রক্ষাকবচ গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগ সংগঠন হিসেবে যদি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ না হয় এবং জনসমর্থন ফিরে না পায়, তাহলে নেত্রীর জন্য এই রক্ষাপ্রাচীর গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষা পেত যদি মধ্যরাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনা মুভমেন্টের খবর জানার পর সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কিছু দুষ্কৃতী কাপুরুষ সেনা অফিসারকে প্রতিরোধের জন্য এগোত। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরও যদি তারা ঘাতকদের ক্ষমতা দখল প্রতিরোধে এগোত। তাতে বঙ্গবন্ধু রক্ষা না পেলেও দেশ রক্ষা পেত।

দেশের স্বার্থে, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখার স্বার্থে এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা যাতে নষ্ট না হয় তার স্বার্থে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ঐক্য, শক্তি ও জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনা দরকার। দলের ভেতর থেকে সব আগাছা নির্মম হাতে উৎপাটন করা দরকার। হাসিনা সরকার দেশের অনেক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, সেদিকে মানুষের নজর তেমন পড়ছে না। কারণ আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির নেতা, কর্মী, মন্ত্রী ও এমপির দৌরাত্ম্যে জনজীবনের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সুশাসন পৌঁছাতে পারছে না। এমনকি সমাজজীবনের উঁচু স্তরেও সুশাসনের সাক্ষাৎ পাওয়া ভার।

সুশাসন ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন। আবার উন্নয়ন ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। হাসিনা সরকারের উন্নয়নের ফসল জনগণের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না, তার কারণ এই উন্নয়নের ফসল আওয়ামী লীগের একটি দুর্নীতিবাজ অংশই লুটেপুটে খাচ্ছে। তাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার দাপটে জনজীবন সন্ত্রস্ত। সুতরাং উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য হাসিনা সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সে জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজের ঘর গোছানো। আওয়ামী লীগকে যদি আবার জনসম্পৃক্ত শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করা যায়, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের মতো তার জনসমর্থন বাড়ে, তাহলে শেখ হাসিনার বর্তমান জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যাবে এবং প্রশাসনিক ত্রুটিবিচ্যুতি কাটিয়ে উঠে সুশাসন প্রতিষ্ঠাও অনেকটা নিশ্চিত করা যাবে। তাতে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার করা যাবে। দেশের স্বাধীনতাকে রক্তাক্ত করার জন্য যে ঘাতকশক্তি নেপথ্যে বসে চক্রান্তের ছুরিতে শাণ দিচ্ছে, তারা নিরুৎসাহ হবে।

লন্ডন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

Print Friendly, PDF & Email

Add Comment