কালের আয়নায়


দফাওয়ারি প্রস্তাব দিয়ে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করা যায় না

 

আরএইচডিএএল.কম : শনিবার ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ :

সূত্র: সমকাল :

 

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বাংলাদেশে এখন সবাই গণতন্ত্রের কথা বলেন। গণতন্ত্র যেন এক অদৃশ্য দেবতা। সবাই তাকে পূজা করে; কিন্তু তাকে দেখা যায় না। যারা একদা ক্ষমতায় বসে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন, তারাও ক্ষমতা হারানোর পর গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না জুড়েছেন। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করার জন্য কেউ কেউ দফাওয়ারি প্রস্তাবও দিচ্ছেন। সর্বশেষ প্রস্তাবটি দিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। তিনি একটি ১১ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। বলেছেন, সারা জীবন ঝুঁকি নিয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন। এখনও এই ঝুঁকি নিয়ে প্রস্তাবগুলো দিচ্ছেন।
প্রস্তাব দিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। যদি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার হিম্মত না থাকে এবং তিনি ঝুঁকি না নেন। বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী এমনকি শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এই ঝুঁকি নিয়েছেন। ক্ষমতাসীন সরকারের অত্যাচার ও লাঞ্ছনার মুখে তারা কোনো অজুহাতে দেশ ছেড়ে বারবার পালিয়ে যাননি। শেখ হাসিনাকে তো এক-এগারোর আধা সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশছাড়া করতে চেয়েছিল। তিনি জীবনের ঝুঁকি ও হুলিয়া মাথায় নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং কোনো দফাওয়ারি প্রস্তাব না দিয়ে কেবল আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত করেছেন।
ড. কামাল হোসেনের ১১ দফা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। কারণ এগুলো কেতাবের গরু, গোয়ালে নেই। এ রকম প্রস্তাব তিনি আগে বহুবার দিয়েছেন। সেসব প্রস্তাবের কথা তার নিজেরও মনে আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। জনসাধারণের স্মরণে সেগুলো মোটেই নেই। এই ১১ দফার ডাকেও জনগণ সাড়া দেবে না, বেশিদিন স্মরণে রাখা তো দূরের কথা। ড. কামাল হোসেনও এ কথা জানেন। তিনি যে মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে সভা-সেমিনার ডাকেন, তার কারণ সম্ভবত এই যে, রাজনীতির মাঠে তার নামটি এখন প্রায় বিস্মৃত হতে চলেছে। মাঝে মধ্যে নানা দফাওয়ারি প্রস্তাব তুলে তিনি যে দেশের রাজনীতিতে একেবারে মাইনাস হয়ে যাননি_ এটা মনে করে সান্ত্বনা পেতে চান।
তবে ড. কামাল হোসেনের অন্য সব প্রস্তাবের কথা মনে না থাকলেও বেশ কয়েক বছর আগের একটি প্রস্তাবের কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। তিনি সুশীল সমাজের একাংশের দ্বারা এমন একটি প্রস্তাব তুলেছিলেন যে, দেশে গুড গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কয়েক বছর নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের বদলে সুধীজন নিয়ে একটি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় রাখা প্রয়োজন। অনেকে মনে করেন, এ ধরনের প্রস্তাব থেকেই এক শ্রেণীর সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তির মাথায় মাইনাস টু থিয়োরিটি জন্ম নিয়েছিল এবং সেটি তারা বন্দুকের জোরে বাস্তবায়নের চেষ্টাও করেছিলেন। সেই চেষ্টা অবশ্য সফল হয়নি। তবে এই চেষ্টার পেছনে ড. কামাল হোসেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাদের সমর্থক সুশীল সমাজের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে অনেকেই মনে করেন।
মাইনাস টু থিয়োরি যারা এক সময় পরোক্ষ অথবা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করেছেন, তারা যদি এখনও ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসেবে পরিচিত থাকতে চান এবং সুশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য বারবার দফাওয়ারি প্রস্তাব নিয়ে মাঠে নামেন, তাহলে দেশের মানুষ তাতে সাড়া দেবে কি? কারণ, এই প্রস্তাবগুলোতে আসলে নতুনত্ব কিছু নেই। তাদের সেই পুরনো কাসুন্দি নতুনভাবে বলা হচ্ছে। ড. কামাল হোসেন বা ড. ইউনূস যে সুশীল সমাজ নিয়ে ওঠাবসা করেন, দেশের মানুষ তাদের বিশ্বাস করে কি? দেশের মানুষ দেখেছে, এই সুশীল সমাজের সুশীলরা দেশে কোনো অনির্বাচিত, স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় বসলেই লাফ দিয়ে মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা অন্য কোনো পদে গিয়ে বসেন। কিন্তু নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বহু সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেই এই সুশীলরা সভা-সেমিনার, গোলটেবিল ডেকে সেই নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের নানা খুঁত আবিষ্কার করতে শুরু করেন।
গণতন্ত্র এবং সুশাসন কেবল চাইলেই চলবে না; তার সংজ্ঞাটিও জনসাধারণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার। বর্তমান হাসিনা সরকার কি গণতান্ত্রিক নয়? তারা কি বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় এসেছে? ড. কামাল হোসেনের ১১ দফার আসল লক্ষ্য দেশে তাদের পছন্দমতো দ্রুত আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠান। কেবল আরেকটি নির্বাচন হলেই দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে কি?
প্রথম কথা, বর্তমান হাসিনা সরকার অগণতান্ত্রিক সরকার মোটেই নয়। তবে দেশে যে গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়া পূর্ণতা পাচ্ছে না তার একটি বড় কারণ, প্রধান বিরোধী দলটির ক্রমাগত নির্বাচন বর্জন ও সংসদীয় অসহযোগিতা। বিরোধী দল ও মোর্চাকে এই অগণতান্ত্রিক কৌশল থেকে মুক্ত না করে কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠান দ্বারা গণতন্ত্রের সমস্যার সমাধান হবে কি? ড. কামাল হোসেনদের প্রস্তাবের আসল উদ্দেশ্য, গণতান্ত্রিক শাসনের প্রক্রিয়াকে পূর্ণতাদান নয়; সরকার বদল করা। অর্থাৎ হাসিনা সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতা থেকে সরানো। হাসিনা সরকার ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত হবে কি? অতীতে বিএনপির এবং বিএনপি-জামায়াতের শাসনামল কী কথা বলে? বর্তমান হাসিনা সরকারের বিকল্প কি আবার বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন?
হাসিনা সরকারের আমলে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে; কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত হয়নি_ এ কথা সত্য। কিন্তু গ্গ্নোবাল ক্যাপিটালিজমের এই পচনশীলতার যুগে উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে পৃথিবীর কোন দেশে এখন সুশাসন নিশ্চিত হয়েছে? ভারতে মোদি সরকার এই সেদিন বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এরই মধ্যে এই সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অপশাসনের অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়েও ভয়াবহ। সেখানে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গি মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে আপসরফা করে চলছে মমতা সরকার। বামফ্রন্ট জনসমর্থন পাচ্ছে না। তৃণমূল পর্যায়ে চলেছে বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘাত, হানাহানি ও রক্তপাত। কেবল নির্বাচন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিরা মনে করেন না।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। জাপানে একটার পর একটা মন্ত্রিসভার পতন ঘটেছে দুর্নীতির অভিযোগে। আমেরিকায় সন্ত্রাস ও দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ব্রিটেনে লোভী ক্যাপিটালিজম ওয়েলফেয়ার স্টেটের ভিত্তিগুলো ভাঙতে গিয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে। সন্ত্রাস বাড়ছে। অন্য দেশে অবৈধ যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইউরোপের দেশগুলো এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে আগত বহিরাগতদের সমস্যায় বিব্রত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঢুকতে গিয়ে অসংখ্য বহিরাগতের মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্বমানবতার জন্যই এক চরম সংকট তৈরি করেছে। অনেকে আশঙ্কা করেন, এই বহিরাগত সমস্যাই ইউরোপের অনেক দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করবে এবং সুশাসন অনিশ্চিত করে তুলবে। কেবল সরকার বদল দ্বারা এ সংকট নিরসন করা যাবে না।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল ছোট দেশের জন্য দরকার ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক পদ্ধতি। উল্লম্ফন নয়, ধীর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটি শ্রেণী সমন্বয়মূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে শ্রেণীবৈষম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট না হয় এবং রাতারাতি নব্য ধনী শ্রেণী গড়ে উঠে তাদের লুটেরা অর্থনীতি দেশটাকে গ্রাস না করে। শিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তারের ওপর জোর দেওয়া হয় এবং সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গি মৌলবাদকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা হয়।
বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ ধরনের একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থাই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাকে হত্যা করে আমরা উল্লম্ফনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছি। অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ডুবন্ত জাহাজের সঙ্গে নিজেদের ছোট ডিঙি বাঁধতে গিয়ে আজ আমাদের এই অবস্থা। এককালে সমাজতন্ত্র কথাটি ছিল আমাদের ধ্যান-জ্ঞান। এখন সমাজতন্ত্র কথাটি আমরা উচ্চারণও করতে চাই না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকেই আমরা সমাজতন্ত্রের পতন বলে ধরে নিয়েছি। তার বিবর্তিত মধ্যপথের কথা ভাবছি না।
আমাদের সুশীল সমাজও এককালে ‘সমাজতন্ত্রী’ ছিলেন। এখন সমাজতন্ত্রের নাম উচ্চারণ তারাও করেন না। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির আদলেই দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান। সুশীল সমাজ এবং রাজনীতিকদের এই ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থা বলবৎ রেখে ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস বা গোটা সুশীল সমাজও যদি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে দেশ সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত হবে না। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।
মৃত বলে বিবেচিত আগ্নেয়গিরির চারপাশে বসতি গড়ে পম্পেই নগরীর বাসিন্দারা ভেবেছিল, তারা চিরকাল আনন্দ-ফুর্তিতে সেই শহরে বসবাস করবে। তারপর আকস্মিকভাবে একদিন মৃত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল। তার বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পম্পেই নগরী ও তার সব অধিবাসী। ড. কামাল হোসেনরা বা আমাদের একটি সুশীল সমাজ বুঝতে পারছেন না বাংলাদেশ এখন সাম্প্রদায়িকতা, হিংস্র মৌলবাদ, নব্য ধনীদের লুটপাট ও দুর্নীতি এবং গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পচনশীল অবস্থায় একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ওপর অবস্থান করছে। যে কোনো সময় এই আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে অথবা কেউ ঘটাতে পারে। তা দফাওয়ারি প্রস্তাব দিয়ে বা হাসিনা সরকারকে কৌশলে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বাধা দেওয়া যাবে না। দেওয়া যাবে বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের দ্বারা। ড. কামাল হোসেন বা সুশীল সমাজের আরাম কেদারার রাজনীতি দ্বারা সেই পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়।
শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যে বড় সাফল্য এই যে, টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতিতেও এই সরকার বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাটুকু অন্তত ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কতদিন তারা তা পারবে তা জানি না। কিন্তু তাদের এই প্রচেষ্টাও একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
লন্ডন, শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
Print Friendly, PDF & Email

Add Comment