বাংলাদেশের রাজনীতিতে নোংরা ভাষা ও নোংরা কাজ

আরএইচডিএএল.কম : সোমবার ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সূত্র: যুগান্তর :

AGC

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সভায় দলনেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সম্পর্কে একটি অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ক্ষমতাসীনরা নোংরা ভাষায় কথা বলে। তারা এখন এমন নোংরা ভাষায় কথা বলে যে, তাদের কথার জবাব দিতেও লজ্জা লাগে। খালেদা জিয়ার এই অভিযোগের একাংশ সত্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন নোংরা ভাষা ও নোংরা কাজ বেড়েছে। এই নোংরা ভাষা সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের পরিপন্থী।

তবে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের যে অংশটি বিতর্কমূলক তা হল, কেবল বর্তমান ক্ষমতাসীনরাই নোংরা ভাষায় কথা বলেন। নিরপেক্ষ ব্যক্তিমাত্রই বলবেন, বিএনপি নেতারা রাজনীতিতে যত নোংরা ভাষা ও নোংরা কাজ আমদানি করেছেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখনও ততটা নোংরা ভাষা ও নোংরা কাজ রপ্ত করতে পারেননি। বিএনপির কাছে তারা এখনও শিক্ষানবিস। বিএনপির একজন নেতা যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী একাই রাজনীতিতে ইতরামি ও নোংরা ভাষা ব্যবহারের যে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন, সেই রেকর্ড ভাঙার সাধ্য আওয়ামী লীগের নেই।

রাজনীতিতে ঠিক নোংরা ভাষা নয়, অশালীন ভাষা ব্যবহারের নজির অতীতেও আছে। কিন্তু তা বর্তমানের মতো এতটা নোংরামির পর্যায়ে পৌঁছেনি। আর কাকতালীয় ব্যাপার এই যে, এই নোংরামিটা শুরু করেছিলেন বিএনপির পূর্বসূরি মুসলিম লীগ দলের নেতারা। বিএনপি সেটাকে পূর্ণতা দান করেছে। পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ নেতারা যখন রাজনীতিতে অশালীন ও অভদ্র ভাষা ব্যবহার শুরু করেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, রাজনীতির ভাষা।

এই প্রবন্ধে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যারা রাজনীতি করতে চান, তারা যাতে আগে রাজনৈতিক শালীনতা ও ভাষা শিখতে পারেন, সে জন্য একটি শিক্ষা কোর্স প্রবর্তন করা দরকার। হাই সাহেবের প্রস্তাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তৎকালীন এক রাজনৈতিক নেতা লিখেছিলেন, সংসদীয় রাজনীতির ভাষা ও আদব-তমিজ শেখার জন্য আমাদের একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ আছে, সেটি হল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। এখানে বিরোধীদলীয় সদস্যকেও অনারেবল মেম্বার অব দ্য পার্লামেন্ট বলে সম্বোধন করতে হয় এবং পার্লামেন্টে এক সদস্য অন্য সদস্যকে মিথ্যাবাদীও বলতে পারেন না। কথাটা শালীনতার সঙ্গে এভাবে বলতে হবে যে, মাননীয় সদস্য সত্য কথা বলেননি।

উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতি, ভাষা ও কার্যক্রম অনুসরণ করে যাত্রা শুরু করেছিলাম। কিন্তু বেশিদিন সে ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারিনি। ব্রিটিশ আমলেই মুসলিম লীগ নেতারা রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে গিয়ে শালীনতাবর্জিত ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত অত্যন্ত রুচিশীল মানুষ। তিনি পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষা ব্যবহার করে গেছেন।

জিন্নাহ তার কংগ্রেসী প্রতিপক্ষ জওয়াহেরলাল নেহেরুকে নাম দিয়েছিলেন পিটার প্যান। এটা অবশ্য অশালীনতা নয়, কিন্তু সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম এবং কংগ্রেস নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ সম্পর্কে তিনি যে ভাষা ব্যবহার করতেন তা অশালীন ও শিষ্টাচার বহির্ভূত। তিনি মওলানা আজাদের নাম দিয়েছিলেন শোবয় অব ওল্ড হিন্দু ফ্যাসিস্ট কংগ্রেস, জবাবে মওলানা আজাদ তাকে কোনো গালি দেননি, রাজনীতি চর্চায় শালীনতা বজায় রেখেছেন।

উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিন্নাহর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই হয়তো পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অভদ্র ও নোংরা ভাষায় গালি দিতে শুরু করেন। যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তখনও মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা, করাচির জাহাঙ্গীর পার্কের সভায় তাকে প্রকাশ্যে লিয়াকত আলী এই বলে গালি দেন যে, He is a mad dog let loose by India (সোহরাওয়ার্দী ভারতের লেলিয়ে দেয়া পাগলা কুকুর)।

পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া একাত্তর সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর তাকে ক্রিমিনাল আখ্যা দিয়েছিলেন এবং ইন্দিরা গান্ধীকে দ্যাট উওম্যান বলে অভিহিত করেছিলেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এই নোংরা ভাষা ও নোংরা কাজের যে অজস্র উদাহরণ রয়েছে, তা বাংলাদেশে অনুসরণ করা শুরু করে মুসলিম লীগ রাজনীতির উত্তরসূরি বিএনপি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে তার ১০ বছরের শিশুপুত্রসহ হত্যা করার পর এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা জিয়াউর রহমান অত্যন্ত অশোভনভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা দেশ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ পর্যন্ত বাংলাদেশে কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা থামেননি, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের উচ্চ কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পুরস্কৃত করেছিলেন। এ ধরনের রাজনৈতিক নোংরামির উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে আর আছে কি?

জিয়াউর রহমান যা করেছেন, তার চেয়ে আরেক কাঠা এগিয়ে গেছেন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি হঠাৎ আবিষ্কার করেন তার জন্মদিন ১৫ আগস্ট। এই জাতীয় শোকের দিনে তিনি বিশাল বিশাল কেক কেটে জন্মদিনের উৎসব পালন শুরু করেন। এটা শুধু রাজনৈতিক নোংরামি নয়, রীতিমতো রাজনৈতিক অশ্লীলতা। এই অশ্লীলতার জন্য বিএনপির বহু বিবেকমান নেতা এখন বিরক্ত ও বিব্রত। প্রতি বছর এই নোংরা নাটকের পুনরাভিনয় চালাচ্ছেন বেগম জিয়া আর আশা করছেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা তার এই নোংরামি গায়ে না মেখে তার ডাকে ছুটে এসে রাজনৈতিক সংলাপে বসবেন। রাজনৈতিক সংলাপে বসতে হলে তার পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। জাতির পিতার মর্মান্তিক হত্যা দিবসকে হ্যাপি বার্থ ডের উৎসবে পরিণত করার চেষ্টা দ্বারা সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় কি?

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে আসার পর বিএনপির বহু নেতা ও কর্মী তাকে যে ভাষায় দিনের পর দিন হুমকি দিয়ে কথা বলেছেন, তা ছিল শুধু নোংরা ভাষা নয়, ছিল ইতরামির ভাষা। শেখ হাসিনাকে হুমকি দিয়ে একাধিকবার বলা হয়েছে, আমরা পঁচাত্তরের পুনরাবৃত্তি ঘটাব, তোকে (শেখ হাসিনাকে) তোর বাপের পথে পাঠিয়ে দেব। শুধু এই হুমকি দেয়া নয়, শেখ হাসিনার জীবন নাশের চেষ্টা হয়েছে অনেকবার। সবচেয়ে বড় হামলা- ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার চক্রান্তে বিএনপির অনেক নেতা, এমনকি তারেক রহমান পর্যন্ত জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সেদিন হেফাজতি-অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় শেখ হাসিনাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের জন্য নোংরা ভাষায় আলটিমেটাম দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। আর এখন তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নোংরা ভাষায় কথা বলার অভিযোগ আনছেন। দেশনেত্রী আয়নায় একবার নিজের মুখ দেখলে ভালো করতেন।

সংসদে দাঁড়িয়েও সংসদীয় শালীনতা ভঙ্গ করার যে নজির বিএনপি নেতারা সৃষ্টি করেছেন তারও তুলনা নেই। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী একজন ব্যর্থ রাজনীতিক হলেও একজন ভদ্রমানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনিও সংসদে বিএনপির সংসদীয় দলের উপনেতা থাকাকালে স্পিকারের দিকে অত্যন্ত অশোভনভাবে কাগজের ফাইল ছুড়ে মেরেছিলেন। আর বেগম খালেদা জিয়া বক্তৃতারত প্রতিপক্ষ দলের সংসদ সদস্যকে ধমক মেরে বলেছিলেন, চুপ বেয়াদব। সংসদীয় গণতন্ত্রে যেখানে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যকেও মাননীয় সদস্য বলে সম্বোধন করা বিধেয়, সেখানে তাকে বেয়াদব বলে গালি দেয়া কি ভদ্রতা?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি যত নোংরা ভাষা ব্যবহার ও নোংরা কাজের উদাহরণ রেখেছে তার তুলনা বিরল। তাদের এই নোংরামি অন্যান্য দলের- বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সংক্রমিত হয়ে থাকলে বিস্ময়ের কিছু নেই। এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সতর্ক হওয়া উচিত। তবে বিএনপি নেত্রী যদি চান দেশের রাজনীতিকে নোংরামি মুক্ত করতে, তাহলে নিজেরা আগে নোংরা ভাষা ব্যবহার ও নোংরা কাজ করা থেকে বিরত হোন। বিশেষ করে দেশনেত্রী তার পুত্র তারেক রহমানকে নোংরা ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত করুন। কথায় বলে- আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও। বিএনপি রাজনীতিতে নোংরা ভাষা, হুমকির ভাষা ব্যবহার বন্ধ করুন, দেখবেন, আওয়ামী লীগও তা অনুসরণ করতে বাধ্য হবে।

আমাদের মহানবীকে (দ.) একবার এক ব্যক্তি এসে বলেছিলেন, হুজুর, আমার ছেলেটিকে বেশি মিষ্টি খেতে নিষেধ করুন। সে বড় বেশি মিষ্টি খায়। রাসূলুল্লাহ্ বললেন, তুমি সাত দিন পর ছেলেকে নিয়ে আমার কাছে এসো। লোকটি সাত দিন পর এলো এবং মহানবী তার ছেলেকে বেশি মিষ্টি না খেতে উপদেশ দিলেন। তা দেখে লোকটি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ্র রাসূল, আপনি সাত দিন আগে আমার ছেলেকে এই উপদেশ দেননি কেন? রাসূলুল্লাহ বললেন, আমারও বেশি মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস। আমি সেই অভ্যাস ত্যাগ করার পর তোমার ছেলেকে উপদেশ দিয়েছি। আমার যে অভ্যাস, সে অভ্যাস নিজে ত্যাগ করার আগে অন্যকে ত্যাগ করতে বলতে পারি না।

মহানবীর (দ.) জীবনের এই উদাহরণটি টেনে বেগম খালেদা জিয়াকে বলতে পারি, রাজনীতিতে নোংরা ভাষা ব্যবহার ও নোংরা কাজ করার অভ্যাস তারা নিজেরা যদি ত্যাগ করেন, তাহলে দেখবেন, অপরেও তা ত্যাগ করছে। বাংলাদেশের রাজনীতিকে নোংরামিমুক্ত করার দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলের। বিএনপির দায়িত্বই সেখানে সমধিক, কারণ এই নোংরামির জন্য তারাই বেশি দায়ী।

লন্ডন : রোববার ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

Print Friendly, PDF & Email

Add Comment