বিলুপ্তির ঝুঁকিতে বোস্তামী কাছিম!

আরএইচডিএএল.কম –

মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০১৫:

সূত্র: প্রথম আলো অনলাইন;

শুরু হয়েছে বোস্তামী কাছিমের প্রজনন ঋতু। হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.)–এর মাজারের পুকুরপাড়ে ডিম পাড়ছে এই প্রজাতির একটি ক​াছিম। প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ায় সংকটে আছে বিপন্ন এই প্রাণী। ছবিটি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তোলা l সৌরভ দাশআন্তর্জাতিক প্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের অতি বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় থাকা বোস্তামী কাছিম বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে প্রজননস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ায় ও আবাসস্থল দূষণের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে প্রাণীটি। অথচ রুটিন পরিদর্শন ছাড়া বিপন্ন এই প্রাণী সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই বন বিভাগের।
কয়েক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল, কেবল বায়েজিদ বোস্তামী (র.)–এর মাজারের পুকুরেই এই প্রজাতির কচ্ছপ টিকে আছে। সম্প্রতি দেশের আরও কিছু জলাশয়ে এই কচ্ছপের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর পরও নগরের ষোলশহর এলাকায় হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.)–এর মাজারসংলগ্ন পুকুরই মিঠা পানির কালো নরম খোলের এই কচ্ছপের সবচেয়ে ভালো আবাসস্থল বলে গবেষকদের কাছে স্বীকৃত। পুকুরের চারটি পাড়ের নরম মাটিতে যুগ যুগ ধরে ডিম পেড়েছে এই প্রজাতির কচ্ছপ। তবে গত কয়েক দশকে পুকুরপাড়ের মাটি শক্ত হয়ে যাওয়া, পুকুর ঘেঁষে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ, কাক, কুকুর, শিয়ালসহ নানা প্রাণী কচ্ছপের ডিম খেয়ে ফেলার কারণে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে প্রজননে। পাশাপাশি মাজারে আগত ভক্তদের দেওয়া খাবারে পানির গুণাগুণও নষ্ট হচ্ছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটায় হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.)–এর মাজারে গিয়ে দেখা যায়, পুকুরের এক পাড়ে বাঁধানো সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন ভক্তরা। কারও হাতে কাঠিতে গাঁথা কলা, কারও হাতে পাউরুটি। পুকুরের পানিতে কাঠি ডুবিয়ে অপেক্ষা করছেন কেউ কেউ। ঢাকা আজিমপুর থেকে আসা মো. হানিফ কলা নিয়ে এসেছিলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বিশাল আকৃতির একটি কচ্ছপ সবুজ শেওলাপড়া পানির ভেতর থেকে গলা বাড়িয়ে খাবার খেল। হানিফ খুশি হয়ে বললেন, ‘মানত করছিলাম, তাই এত দূর আসা। কচ্ছপ খাইলে মানত পূর্ণ হয় শুনছি।’
১৭ শতকে খনন করা এই পুকুরের এক পাড়ে সিঁড়ি, বাকি তিন পাড় কচ্ছপের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র। ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বোস্তামী কাছিমের ডিম পাড়ার মৌসুম। মাজার প্রাঙ্গণে পণ্যের পসরা নিয়ে বসা লোকজন জানান, ডিম পাড়া এখনো শুরু হয়নি। তবে পুকুরের পাড় ধরে খানিকক্ষণ এগোতেই দেখা গেল একটি কচ্ছপের পাশে সদ্য খুঁড়ে তোলা মাটির স্তূপ। একটু একটু কাঁপছিলও সেটা। প্রায় ঘণ্টা খানেক পর খুঁড়ে তোলা মাটি সমান করে পুকুরে ফিরে গেল কচ্ছপটি। কাছে গিয়ে খানিকটা মাটি সরাতেই চোখে পড়ল কয়েক সেন্টিমিটারের গোল সাদা ডিম। তবে এরপর প্রায় মাস খানেক নিয়মিত অনুসন্ধান করেও আর কোনো কচ্ছপের ডিম পাড়ার কথা জানা যায়নি। ১২ মার্চ মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, কিছু কচ্ছপ ডিম পাড়তে উঠে এলেও ডিম দেয়নি। এবার মার্চ মাসের মাঝামাঝি গড়িয়ে গেলেও ভালোভাবে ডিম পাড়া শুরু হয়নি কচ্ছপের। বোস্তামী কাছিম নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.)–এর মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত পুকুরটির দৈর্ঘ্য ৯৮ দশমিক ৮ মিটার এবং প্রস্থ ৬১ দশমিক ৩ মিটার। শুষ্ক মৌসুমে পুকুরটির গভীরতা আড়াই মিটার ও বর্ষায় পাঁচ মিটারে দাঁড়ায়। মাজার কর্তৃপক্ষের হিসাবে বর্তমানে পুকুরে ছয় শর বেশি কচ্ছপ আছে পুকুরে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসানের নেতৃত্বে ১৯৮৫ সালে ‘ক্যাপচার, মার্ক ও রিলিজ’ পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপে ৩২০টি কচ্ছপের হিসাব পাওয়া যায়। মাজার কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৩ সালে মাজারের পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে একদল দুষ্কৃতকারী। তখন পুকুর সেচে পানি পরিবর্তন করা হয়। সেবার প্রায় ৭০০টির মতো কচ্ছপ গণনা করা হয়।
মাজারের পুকুরে বোস্তামী কাছিমবিলুপ্তির ঝুঁকি: বোস্তামী কাছিমের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় ও রক্ষণাবেক্ষণ সঠিক না হওয়ায় শঙ্কিত গবেষকেরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. ফরিদ আহসান বিপন্ন প্রাণীটি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। এক গবেষণা নিবন্ধে এই প্রজাতির কচ্ছপের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ছয়টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেন তিনি।
১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে ‘দ্য বোস্তামী অর ব্ল্যাক সফটশেল টার্টল, অ্যাসপিরিডেটেস নিগ্রিকানস: প্রবলেমস অ্যান্ড প্রোপোসড কনসারভেশন মেজারস’ শিরোনামে নিবন্ধটি ছাপা হয়। এসব ঝুঁকি হলো বিপজ্জনকভাবে কচ্ছপের সংখ্যা হ্রাস, নির্দিষ্ট একটি এলাকায় আবদ্ধ থাকা, প্রজননের ক্ষেত্র ছোট হয়ে যাওয়া, ডিম নষ্ট ও অন্য প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হওয়া, বংশবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া ও ছত্রাকজনিত কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি। এসব ঝুঁকি নিরসনে এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি কোনো সংস্থা। প্রজনন মৌসুমে বন বিভাগের লোকজন কয়েকবার পরিদর্শন করে ডিম গণনা করেন। এ ছাড়া কচ্ছপ সংরক্ষণে আর কোনো উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে সরকারের কোনো বরাদ্দও নেই।
যোগাযোগ করা হলে ড. ফরিদ আহসান বলেন, কচ্ছপগুলোর ডিম পাড়ার উপযুক্ত স্থান হলো পুকুরের পাড়। তবে এখন পুকুরের পাড়ের মাটি শক্ত হয়ে পড়ায় প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হতে বসেছে। পাশাপাশি পুকুরের পাড়ে শিয়াল, কাক ও কুকুরের মতো প্রাণীর কারণে ডিম নষ্ট হয়। এই প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রটি পুরোপুরি সংরক্ষণ না করলে কচ্ছপগুলো সংকটে পড়বে। তিনি আরও বলেন, যথাযথ জরিপ, পুকুরের পানি পরীক্ষা, আরও একটি প্রজননক্ষেত্র তৈরি, ছত্রাক সংক্রমণ হ্রাসসহ নানা উদ্যোগ নিলে কচ্ছপগুলো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র: বােয়জিদ বোস্তামী (র.)–এর মাজারসংলগ্ন পুকুরের চারটি পাড়ের একটি সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। মহাসড়কের পাশে পুকুরের পূর্ব পাড় একসময় উর্বর প্রজননক্ষেত্র ছিল। গবেষকেরা জানান, মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ায় সে স্থানে এখন ডিম পাড়ে না কচ্ছপেরা। মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে উঠে আসে নানা তথ্য। জানা যায়, ২০০৮ সালে মাজার কর্তৃপক্ষ কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত পুকুরের পূর্বপাড়ে বিপণিবিতান নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। তবে পরিবেশ সংগঠনের বাধার মুখে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী আনোয়ারুল ইসলাম জানান, মাজার কর্তৃপক্ষ পুকুরের পাড়ে নির্মাণকাজ শুরু করলে ২০০৮ সালের ১৩ মার্চ আইনি নোটিশ পাঠায় বেলা। পরে ২০১২ সালে আবার নির্মাণকাজ শুরু হলে আদালতে রিট দায়ের করা হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। পুকুরের পাড় কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র হওয়ায় আদালত ওই স্থানে স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ হলেও মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ায় পূর্ব পাড়ে আর ডিম পাড়ে না কচ্ছপগুলো।
দর্শনার্থীদের দেওয়া খাবারে দূষিত হচ্ছে পুকুরের পানি l প্রথম আলোতবে মাজার কর্তৃপক্ষ বন বিভাগের সহায়তায় পুকুরের কয়েক গজ দূরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা জায়গায় কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। কাক ও শিয়াল থেকে ডিম বাঁচাতে সেখানে তারের জালিও দেওয়া হয়েছে। ডিম পাড়ার জন্য কোনো কচ্ছপ উঠে এলে মাজারের স্বেচ্ছাসেবকেরা কচ্ছপগুলোকে সেখানে বহন করে নিয়ে যান। ডিম পাড়া শেষ হয়ে আবার রেখে আসেন পুকুরে।
আরও কিছু ঝুঁকি: মাজারে আসা ভক্তরা কচ্ছপগুেলাকে কলা, মাংস, পাউরুটি, মুুড়িসহ নানা খাবার খেতে দেন। এতে পুকুরের পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মাজারের মোতোয়ালি খোরশেদ আলম বলেন, এখানকার কচ্ছপগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে মাজারের ভক্তরা। বিষয়টির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস জড়িত।
বন বিভাগ ও মাজার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: নগরের ষোলো শহরে অবস্থিত বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কচ্ছপগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার কোনো কর্মসূচি তাঁরা নেননি। এ নিয়ে সরকারের কোনো বরাদ্দও নেই। সংস্থার সহকারী বন সংরক্ষক কাজল তালুকদার জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকে রুটিন পরিদর্শন করা হয় ডিম ছাড়ার মৌসুমে। গত মৌসুমে কচ্ছপগুলো ২৬১টি ডিম পেড়েছিল। আর ডিম ফুটে ৪১টি বাচ্চা হয়েছিল।
তবে পুকুরের পানির নমুনা পরীক্ষা, দীর্ঘ সময়ের গবেষণা ও অন্য কোনো স্থানে এই প্রজাতির নমুনা সংরক্ষণ প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন। এ বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, একবার এই পুকুরে বিষ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সে ঘটনায় কচ্ছপের কোনো ক্ষতি না হয়নি। কিন্তু এমন ঘটনা আবার ঘটতে পারে। তা ছাড়া কোনো রোগে বা বিপর্যয়ে যদি প্রাণীগুলো হারিয়েও যেতে পারে। এই জন্য পৃথক কোনো স্থানে এই প্রজাতির নমুনা সংরক্ষণ করা উচিত।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মাজার কর্তৃপক্ষ জানায়, অন্যত্র নমুনা সংরক্ষণে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে এই পুকুরের বাইরে কচ্ছপগুলো বাঁচে না বলেই তাঁরা মনে করেন।

Print Friendly, PDF & Email

Add Comment